ডেঙ্গু জ্বর – কারণ এবং লক্ষণ

ডেঙ্গু জ্বর, যাকে ব্রেক বোন জ্বর বলা হয়ে থাকে, এই জ্বর এক প্রজাতির মশার কামড়ের কারণে হয় যার নাম এডিস মশা- যে এই রোগের ভাইরাস বহন করে। ডেঙ্গু জ্বর প্রায়শই যন্ত্রনাদায়ক এবং অসহ্য হয়। ১০০ থেকে ৮০০ বছর পূর্বে প্রথমবার এই ভাইরাস বানর থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় কিন্তু ততদিন চিন্তার কোনও কারণ হয়ে ওঠেনি যতদিন না বিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকা মহাদ্বীপে এই রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, এবং তারপর এই রোগ বিশ্বের গ্রীষ্মপ্রধান এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে, ডেঙ্গু জ্বর প্রায়শই দেখা যায় এবং ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন এবং তাইওয়ানের সর্বত্র এটি বহু মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে। যেহেতু ডেঙ্গুর কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা প্রতিষেধক নেই, তাই এই রোগের চিকিৎসা, লক্ষণগুলিকে নির্মূল এবং নষ্ট করার মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এছাড়া, মশার কামড় এড়িয়ে জ্বর প্রতিরোধ করা যেতে পারে; তাই, এই মশা বাহিত রোগ ছরিয়ে পড়া রোধ করতে ডেঙ্গুর কারণ এবং লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা প্রসারিত করতে হবে   

ডেঙ্গু জ্বরের কারণ

ডেঙ্গু একটি মশা বাহিত রোগ যা এডিস মশার কামড়ের দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। এই মশা ডিইএনভি নামের ভাইরাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত চারটি ভাইরাসের মধ্যে একটি ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ হয়ে ওঠে। এডিস মশা চারটির মধ্যে কোনও একটি ভাইরাসের বাহক হতে পারে এবং তারফলে, ব্যক্তিও সেই নির্দিষ্ট ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন। এডিস মশা বাড়ির বাইরে বা ভিতরে পাত্রে থাকা জমা জলে প্রজনন করতে পারে এবং তার জন্মস্থান থেকে ২০০ মিটারের বেশি দূরত্ব পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে না। যাইহোক, এই মশা পুকুরে, খাতে এবং অন্যান্য জলাধারে প্রজনন করে না। মশার এই প্রজাতি ভোরবেলায় এবং সুর্যাস্তের পরে বিকেল বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে।

যখন সংক্রমিত এডিস মশা সুস্থ্য ব্যক্তিকে কামড়ায়, মশাটি ডেঙ্গুর ভাইরাস ( চারটির মধ্যে কোনও একটি) সেই ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চারিত করে; তারফলে যখন ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত নয় এমন মশা সেই ব্যক্তিকে কামড়ায়, সেই মশাটি ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হয়ে যায়, এইভাবে সেই মশাটি এই রোগ ছড়ানোর প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে পড়ে। তারপর এই সংক্রমিত মশা অন্য কোনও সুস্থ্য ব্যক্তিকে কামড়ায়, এবং এইভাবেই রোগের ধারা চলতেই থাকে। যে ব্যক্তি একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন সেই ব্যক্তি আবার চারটি ভাইরাসের মধ্যে যে কোনও একটি ভাইরাসের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারেন। যাইহোক, যে ব্যক্তি ইতিমধ্যেই নির্দিষ্ট ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন সেই ব্যক্তি পুনরায় সেই নির্দিষ্ট ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন না। সব সময়ই প্রথম সংক্রমণের থেকে দ্বিতীয় সংক্রমণের লক্ষণ তীব্র ও মারাত্মক হয়।

গবেষণা অনুসারে, বিশ্বের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ মানুষ সেই সব স্থানে বাস করেন যেখানে ডেঙ্গু সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ মশার কামড়ের ৪ থেকে ৭ দিন পর দেখা যায় এবং ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যদিও ডেঙ্গু জ্বর অত্যন্ত বেশি ছড়িয়ে পড়া একটি রোগ, যদি প্রাথমিক স্তরেই লক্ষণ সনাক্ত করা যায় তাহলে খুব সহজেই সারানো যায়। তাই, হৃদয়, ফুসফুস বা যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো রোগের জটিলতা এড়াতে সময়মত চিকিৎসা করার জন্য এই রোগের লক্ষণগুলি জানা অত্যন্ত আবশ্যক। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর কারণে রক্তচাপ অত্যাধিক কম হয়ে যেতে পারে যারফলে রোগী আঘাত পেতে পারে এবং মৃত্যুও হতে পারে।

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণগুলি জানা এবং সনাক্ত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে সময়মত চিহ্নিত করা যায় এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায়।  ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ সাধানরত সংক্রমিত মশা কামড়ানোর চার দিন পরে দেখা যায় এবং ১০ দিন পর পর্যন্ত বা তারও বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে যা রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে। বেশিরভাগ সময়, ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ দেখে ভাইরাল জ্বর, সংক্রমণ বা ফ্লু বলে ভুল করা হয় যারফলে চিকিৎসায় বিলম্ব হতে পারে; তাই, পার্থক্য করতে রোগের লক্ষণ স্পষ্টভাবে সনাক্ত করা বাধ্যতামূলক।

ডেঙু জ্বরের কিছু সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:

  • কারণ ছাড়া, হঠাৎ উচ্চ জ্বর
  • অসহ্য মাথা ধরা
  • চোখের ওপরে কপালে ব্যাথা
  • পেশিতে এবং গাঁটে তীব্র ব্যাথা
  • প্রচন্ড দুর্বলতা এবং ক্লান্তি
  • বমি বমি ভাব
  • বমি করা
  • ত্বকে ফুসকুড়ি
  • সহজে ক্ষত হওয়া বা রক্তপাত
  • হজমের গোলমাল
  • ডাইরিয়া
  • স্ফীত গ্রন্থি

ডেঙ্গুর কিছু ক্ষেত্রে অল্প কিছু লক্ষণই দেখা দেয়, যা নির্দিষ্ট ওষুধ খেলে, বিশ্রাম নিলে এবং অনেক পরিমাণে জল পান করলেই সেরে যায়। যদিও, অন্যান্য ক্ষেত্রে, লক্ষণ খুব বেশী মাত্রায় হতে পারে এবং তারফলে শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিরল কিছু ক্ষেত্রে, ডেঙ্গু প্রাণনাশক হতে পারে, যদি তা সঠিক সময়ে সনাক্ত এবং চিকিত্সা না করা হয়।

ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যাক্তি সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে সেরে ওঠেন, কিন্তু যখন লক্ষণগুলি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন ডেঙ্গু জ্বর প্রাণঘাতী হয়ে যায় বিভিন্ন কারণে যেমন লিম্ফ এবং রক্ত নালিকা ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হওয়া, প্লেটলেট্‌স অত্যাধিক কম হয়ে যাওয়া, নাক এবং মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ হওয়া, লিভার বৃদ্ধি এবং সংবহন তন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া। এইরকম বিষম দশায় ডেঙ্গুকে ডেঙ্গু শক্‌ সিন্ড্রোম (ডি এস এস) বলা হয়ে থাকে এবং জটিলতা এড়াতে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসা পরিষেবার প্রয়োজন।

কিছু লক্ষণ যা ডেঙ্গু জ্বরের এই প্রকার বিষম অবস্থা সনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে:

  • পেটে তীব্র যন্ত্রণা
  • ক্রমাগত বমিভাব এবং বমি হওয়া
  • মাড়ি, নাক এবং ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ
  • প্রস্রাবে বা বমিতে রক্ত
  • লঘু শ্বাস
  • দ্রুত হ্রিদস্পন্দন
  • হিমশীতল ত্বক
  • অব্যক্ত অস্বস্তি

বলা হয়, উপরোক্ত লক্ষণগুলি কখনও কখনও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে; তাই, সর্বদা রক্ত পরীক্ষা করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার সুপারিশ করা হয়। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ নেই; যদিও চিকিত্সার ধারা প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষণগুলি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।

অন্যদিকে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তি অ্যাসিটোমিনোফেন বা প্যারাসিটামল যুক্ত ব্যথা নিবারক ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন এবং সেইসব ওষুধ যাতে অ্যাস্পিরিন আছে এড়িয়ে চলবেন কারণ এই জাতীয় ওষুধ থেকে রক্তক্ষরণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়াও, সেই ব্যক্তির তৎক্ষণাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং এর সঙ্গে অধিক পরিমাণে তরল পানীয় এবং জল পান করা উচিৎ; সঙ্গে বিশ্রাম নিলেও উপকার পেতে পারেন। শিশুদের ক্ষেত্রে, কোনও প্রকার ওষুধ প্রয়োগ করার পূর্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব যোগাযোগ স্থাপন করা উচিৎ।